গান করা হারাম কুরআনের কোথায় বলা আছে?

0
118

ইসলামে গান করা নিষেধ কেন

অনেকেই এমন প্রশ্ন যে, গান করা হারাম কুরআনের কোথায় বলা আছে?

অধিকাংশ সময়ই তারা আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে শয়তানি নফসকে কোন রকম বুঝ দিয়ে এই পাপাচারে লিপ্ত থাকেন। আজকে তাদের কে ঘিরে গান সমন্ধে কুরআনের আয়াত, তাফসীর ও সালাফদের কিছু মতামত তুলে ধরলাম।

🔹মক্কার কাফের মুশরিকরা কোরআন শিক্ষা তথা কোরআন শ্রবণ থেকে মানুষদের বিরত রাখার জন্য ঘোষণা দিয়েছিল ।
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآَنِ وَالْغَوْا فِيهِ
لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ

অর্থঃ আর কাফেরেরা বলে, তোমরা এ কোরআন শ্রবণ করোনা, এবং এর আবৃত্তিতে হট্টগোল সৃষ্টি কর, যাতে তোমরা জয়ী হও । ( সূরা হা-মীম সেজদা আয়াত: ২৬)

📚তাফছিরে কুরতুবীতে লিখেন :- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আবু জেহেল অন্যদেরকে প্ররোচিত করল যে, মুহাম্মদ যখন কোরআন তেলাওয়াত করে, তখন তোমরা তার সামনে গিয়ে হৈ-হুল্লোড় করতে থাকবে, যাতে সে কি বলছে তা কেউ বুঝতে না পারে । কেউ কেউ বলেন, কাফেরেরা শিশ দিয়ে, তালি বাজিয়ে এবং নানারূপ শব্দ করে কোরআন শ্রবণ থেকে মানুষকে বিরত রাখার প্রস্তুতি নিয়েছিল ।

📖 আল্লাহ তাআলা সূরা লুকমানে আখেরাত-প্রত্যাশী মুমিনদের প্রশংসা করার পর দুনিয়া-প্রত্যাশীদের ব্যাপারে বলছেন,

((وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ))

অর্থঃ “এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং উহাকে (আল্লাহর পথ) নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে । এদের জন্যে রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি”।
(সূরা লোকমান: ০৬)

🔝উক্ত আয়াতের শানে নুযূলে বলা হয়েছে যে, কেউ কুরআন শ্রবণের ইচ্ছা করলে তাকে গান শোনানোর জন্য সে গায়িকাকে আদেশ করত এবং বলত মুহাম্মদ তোমাদেরকে কুরআন শুনিয়ে নামায, রোযা এবং ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার কথা বলে । এতে শুধু কষ্টই কষ্ট। তার চেয়ে বরং গান শোন এবং জীবনকে উপভোগ কর ।

এছাড়া তাফসীরে ফাতহুল মাজীদে বলা হয়েছে যে,
মক্কার মুশরিক ব্যবসায়ী নযর বিন হারেস ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে সফর করত। সে একবার পারস্য থেকে কেসরা প্রমুখ আজমী সম্রাটগণের ঐতিহাসিক কাহিনীর বই ক্রয় করে আনল এবং মক্কার মুশরিকদেরকে বলল, মুহাম্মাদ তোমাদেরকে আ‘দ, সামূদ প্রভৃতি সম্প্রদায়ের কিসসা কাহিনী শোনায়। আমি তোমাদেরকে রুস্তম, ইসফেন্দিয়ার প্রমুখ পারস্য সম্রাটগণের সেরা কাহিনী শুনাই। মক্কার মুশরিকরা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে আনীত কাহিনী শুনতে থাকে। কারণ এগুলোতে শিক্ষা বলতে কিছু ছিল না বরং এগুলো ছিল চটকদার গল্পগুচ্ছ।

⏩অন্যত্র বলা হয়েছে, যখন কেউ কুরআন শ্রবণের ইচ্ছা করতো তখন তাকে গান শোনানোর জন্য ‘নযর বিন হারেস’ গায়িকাকে আদেশ করত এবং বলত মুহাম্মদ তোমাদেরকে কুরআন শুনিয়ে নামায, রোযা এবং ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার কথা বলে । এতে শুধু কষ্টই কষ্ট । তার চেয়ে বরং গান শোন এবং জীবনকে উপভোগ কর ।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. কে উক্ত আয়াতের ‘লাহওয়াল হাদীস’-এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তা হল গান’ ।

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি. বলেন,
‘গান অন্তরে নিফাক জন্ম দেয় যেভাবে পানি উদ্ভিদ জন্য দেয়।’
[মাসআলাতুশ-শামায়ি- ইবনুল কাইয়্যিম রহ.]

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একই কথা বলেন । তাবেয়ী সায়ীদ ইবনে যুবাইর থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী রাহ. বলেন, উক্ত আয়াত গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে, যা বান্দাকে কুরআন থেকে গাফেল করে দেয় । (তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/৪৪১. তাফসিরে তাবারী)

📖 কুরআন মজীদের অন্য আয়াতে আছে, ইবলিস-শয়তান আদম সন্তানকে ধোঁকা দেওয়ার আরজী পেশ করলে আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে বললেন, -“তোর আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস পদস্খলিত কর।” -সূরা ইসরা : ৬৪

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে সকল বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তাই ইবলিসের আওয়াজ ।
বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে ।

▶আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্যই সেরা । এজন্যই একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে । -ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯

তিঁনি আরো বলেন, ‘গানের প্রতি ভালোবাসা এবং কুআনের প্রতি ভালোবাসা বান্দার অন্তরে একসাথে অবস্থান করতে পারে না।
কেননা একটি অপরটিকে তাড়িয়ে দেয়।’
[মাদারিজুস-সালিকীন]

ইমাম মালেক রাহ. কে গান-বাদ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেবল ফাসিকরাই তা করতে পারে । -কুরতুবী ১৪/৫৫

⏩ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন যে, গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি হল আহমক । তিনি আরো বলেন, সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম এবং এর শ্রোতা ফাসেক । তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না ।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৭৯; কুরতুবী ১৪/৫৫

হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল্লামা আলী মারদভী লেখেন, বাদ্য ছাড়া গান মাকরূহে তাহরীমী । আর যদি বাদ্য থাকে তবে তা হারাম । -আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৩৮৮

🔷ইমাম ইবন তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন:
সেই ব্যক্তির সম্পর্কে যার স্বভাব হল গান-বাজনা শোনা,

“ সে যখন কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করে তখন সে আবেগাপ্লুত হয় না, অপরদিকে সে যখন শয়তানের বাদ্যযন্ত্র (গান-বাজনা) শ্রবণ করে, সে নেচে উঠে । যদি সে সালাত প্রতিষ্ঠা করে, তবে সে হয় বসে বসে তা আদায় করে অথবা মুরগী যেভাবে মাটিতে ঠোকর দিয়ে শস্যদানা খায় সেভাবে দ্রুততার সাথে আদায় করে । সে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করতে অপছন্দ করে এবং তাতে কোন সৌন্দর্য খুঁজে পায় না। তার কুরআনের প্রতি কোন রুচি নেই এবং যখন তা পড়া হয় সে এর প্রতি কোন টান বা ভালোবাসা অনুভব করে না। বরং, সে মু’কা ও তাসদিয়া শুনে মজা পায় । এগুলো শয়তানী আনন্দ এবং সে তাদের অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে একটি শয়তান নিযুক্ত করে দেই, অতঃপর সেই সর্বক্ষণ তার সাথী হয়ে থাকে” ।

মহান রাব্বুল আলামীন যেন আমাদের সবাইকে এ রকম পাপাচার থেকে রহম করেন এবং আমাদের অন্তরকে যেন তাঁর প্রতি আনুগত্যশীল করে দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here