নিশীতে নূর: চোখে পানি আসার মতো একটি ইসলামিক ছোট গল্প

0
116

✨ নিশীতে নূর✨



একদিন অন্ধ ছেলেটি সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটছিলো। তার হাতে ছিলো লেমিনেটিং করা পুরোনো একটি সার্টিফিকেট। তবে এটা উচ্চতর কিংবা মাধ্যমিক কোন গ্রাজুয়েশনের নয়। এটা কেবলই তার অন্ধত্ব আর অসহায়ত্বের দলীল, যেটা কিনা কোটি কোটি অবিশ্বাসী, হিংস্র ও স্বন্দেহপ্রবণ চোখকে বিশ্বাস করানোর সামান্যতম চেষ্টামাত্র।

___প্রাণবন্ত সমুদ্র ; ঢেউ যে তার হিংস্র যৌবন তা ১৩ বছরের ছেলেটির ভালোই জানা।

ও..
সে হলো ‘নূর’। মা-বাবা বেশ শখ করেই তার নামটি রেখেছিল, কিন্তু জন্মান্ধ তার নামকে গ্রাস করেছে।

পৃথিবীর উজ্জ্বল আলো আরো বেশি কুচকুচে কালো হয়ে যায় সেদিন, যেদিন শেষ বারের মতো ঘুরতে এসে এই সমুদ্রের তরে মা-বাবাকে অকাতরে বিলিয়ে দিতে হয়েছিলো, বুকভরা আর্তনাদে.. আজও মায়ের হাতের রান্না করা সমুদ্রের বাতাসে মিশে থাকা সেই দিনের বিরিয়ানির ঘ্রাণ সে ভুলতে পারেনা..

🔽
‘নূরের’ এখানে ৫ বছর পেরিয়ে…

আজ সমুদ্র তীরে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ একটা ধমকা বাতাসের ঘ্রাণ তাকে থামিয়ে দিলো। সে এগোতে থাকে, আরেকটু এগিয়ে একমনে নিস্তব্ধতার সাথে জোড়ে জোড়ে নাক টেনে অনুভব করছিলো, তার মায়ের হাতের সেই বিরিয়ানির ঘ্রাণ..
তবে কি তার মা এখনও..!

___’মা…, তুমি এসছো..?
কত যে দীর্ঘ:শ্বাস নিয়েছি কিন্তু সেদিন থেকে তোমার হাতের বিরিয়ানির ঘ্রাণ আর পাইনি…..
(আরেকটু এগিয়ে হাঁটু ঘেরে বসে)
‘মা’..? জানো….

নূরের অফুরন্ত কথা শেষ না হতেই, একটা অশ্লীল ও তীক্ষ্ণ শব্দ তার কানে লাগে,

___’তোদের জ্বালায় কি কোথাও খেতে ও বসতে পারবো না ···· ?
যা… ভাগ এখান থেকে.. যত্তসব….’

সহসাই নূরের ক্ষুধার্তময়ী আবেগ বাস্তবতায় রূপ নিলো।

‘নূর’ হাঁটছে ৫ বছরের পুরোনো পথে, এখন আর তাকে স্ট্রীক নিয়ে হাটতে হয়না, কেননা চক্ষুবানরা ও যা দেখে না, চক্ষুহীনরা ও তার অনেক কিছুই দেখে।

🔽

পুরো বিষয়টা খেয়াল করছিলো বড়লোক বাবা মায়ের একমাত্র আদরের ছোট্ট মেয়েটি। যার বয়স ৫ এর অধিক নয়। কিছুক্ষণ আগেও বিরিয়ানি খেতে কেঁদেছিল খুব, কিন্তু এবার তার নতুন বায়না। যতক্ষণ না সমুদ্রের পাড়ে আকাশে ছুটে চলা ঐ ঘুড়ি গুলো তার মুঠোয় এনে দেয়, ততক্ষণ সে এখান থেকে উঠতেই চাইবেনা। তার ‘মা’ জানে সে কতটা নাছোড়বান্দা…

____ হ্যাঁলো… তুমি কোথায়,
আর কতক্ষণ লাগবে?..
অফফ্ , তুমি না… এটুকু বলেই কান থেকে ফোনটা নামিয়ে হাঁটতে শুরু করলো তার ‘মা’….

সেই সুযোগে বাচ্চা মেয়েটি ‘নূরের’ পিছু পিছু সেই স্থানে গেল, যেখানে ‘নূর’ তার স্রষ্টার কাছে যাবতীয় ফরিয়াদ করে। সে তখনও তার প্রিয় সূরাটি তেলাওয়াত করছিলো ও কাঁদছিলো।

মেয়েটি তারপাশে এসে বসলো । নূর তেলাওয়াত বন্ধ করে, বিস্মিত হয়ে..

-কে? কে এখানে?
-আমি “নিশী”, আচ্ছা তুমি কেনো কাঁদছো?
আম্মু বকা দিয়েছিলো সেজন্য..?

– (চেনা সুরে, চোখটা মুছে)কই নাতো..!

-না… আমি জানি তুমি আম্মুর বকাতেই কাঁদছো । এই নাও তোমার জন্য আমার বিরিয়ানি টুকু নিয়ে আসছি, আম্মু আসার আগেই খেয়ে নাও জলদি..

‘নূর’ খেতে না চাইলেও ‘নিশী’ নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত দুজনই একসাথে খেতে বসলো। এটাই মনে হয় আদুরের ‘নিশীর’ নিজের হাতে প্রথম খাওয়া ।
____চলছে নূরের গল্প…..


হঠাৎ একটি ‘ঝাল মরিচ’ নিশির পিপাসা বাড়িয়ে দেয়। পানির বোতল টা তার আম্মুর ব্যাগে। নিশী চুপি চুপি সমুদ্রের খুব কাছে পানি খেতে যাচ্ছিলো, নূর কিছুটা টের পেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো নিশীর দিকে তাকে বাঁধা দিতে। কারণ এই সমুদ্রের হিংস্রতা সবচেয়ে ভালো তারই জানা।
কিন্তু নাছোড়বান্দা নিশী এগিয়েই যাচ্ছে….

নূরের বুকটা ধড়পড় করছে,
এমন সময় নূর একটা শব্দ শুনতে পেল..
!
!
!
!
___ ঝাল কমেছে আমার…
নূর এবার স্বস্তির পেল..।
নিশী এগিয়ে আসছে নূরের কাছে..


হঠাৎ এমনি একটা বাতাস নূরের ভিতরটা ছিঁড়ে নিচ্ছিল, নূর কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই পাহাড় সমান এক ঝাপটা পানি তাকে ভারসাম্যহীন করে ভাসিয়ে নিয়ে যায় গভীরে। সাঁতরিয়ে কিছুটা কিনারে আসলেও, নিশীর উপস্থিতি সে আর অনুভব করতে পারছেনা।

নিশী .. নিশী বলে হাঁ-মাঁও করে চিৎকার দিয়ে কাঁদছে। ব্যস্তময় তীরের অনেকেই তার কান্না শুনতে পাচ্ছিলো কিন্তু সবার কাছেই সে একজন অন্ধ পাগল ব্যতীত আর কিছু নয়…..

— —- —

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here