ভালো ক্যারিয়ার মানেই কি ব্যাংক জব?

0
44

এক ইমিডিয়েট বড় ভাইয়ের হল রুমে গেলাম।অনেকদিন পর ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসা। আগেই বলে নেই, ধর্মীয় মূল্যবোধ আমাদের উপরে উপরে যতটুকু ছুঁই, ভাইয়ার ভিতরটাই ছিল আরো গভীর।

টেবিলে উল্টো হয়ে পড়ে আছে দাসত্ব আদায়ের যুদ্ধের কিছু বই। বইগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ পড়লো একটা নীল ও লাল বর্ণের চমকপ্রদ একটি বইয়ের দিকে। যা কতগুলো বইয়ের নিচে চাপা লেগে আছে। তবে বইটার সাইডবার এমন করে গোছানো ছিল যে, টেবিলে তাকালেই চোখে পড়বে যে কারোর।

বইটা দেখে একটু অবাক হলাম, ভাবলাম ভাইয়ার ভিতরটা মনে হয় আমাদের বাহিরেরটার সাথে মিলে গেছে। তাই কৌতুহল নিয়ে বইটা হাতে নিলাম। বইটা হাতে নিয়েই এটার মাঝ বরাবর খুলে ফেললাম। যেকোন বই দেখলেই আন্দাজে ঐ বইয়ের মাঝখানের কিছু অংশ খুলে, নিজেকে সেখানে যাচাই করে নেয়ার অভ্যাসটা আমার অল্পকিছু দিনের। শুনেছিলাম এতে নাকি কনফিডেন্স লেভেল হাই হয়! তবে আজব্দি আমি এই প্রসেসে কখনো কনফিডেন্স ধরে রাখতে পারিনি!

যাইহোক, বইয়ের ভিতরটা আমাকে খুব কনফিউশনে ফেলে দিয়েছিল। কেননা এটা আমার দেখা অন্য বই গুলোর মতো নয়। না.. আমি বইয়ের স্ক্রিপট নিয়ে কথা বলছিনা, আমি বলছি বইয়ের পাতা গুলোর দৃশ্যপট নিয়ে। পুরো বইটিতেই কমবেশি কালারিং পেন দিয়ে মার্ক ও আন্ডারলাইন করা আছে। বইটির ভিতরের দৃশ্য দেখলে যেকোন দৃশ্যমান ব্যক্তিই নিশ্চিত হবে যে, এটা একজন বইপোকার বই! যেখানে একেকটা পৃষ্টা মিনিমাম অর্ধশতবার হাতের ছোঁয়া লেগে পাতাগুলো দুর্বল ও নিস্তেজ হবার কথা। কিন্তু সেগুলো ছিলো প্রাণবন্ত, মোলায়েম আর ছিল নতুন পাতার ঘ্রাণ।

ভাইয়ের সাথে পরিচয় আমার কলেজ লাইফ থেকেই, আমি জানি তার পড়াশুনার স্টাইল কেমন! তিনি যখনই কোন বই পড়তেন, সেই বইয়ের পাতাগুলো হতো খুবই নরম আর পাতলা। বইয়ের লিখা গুলো যেন গিলে খেতেতার নিজ কলমের দাগে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ব্যাংক জব প্রিপারেশনের এই বইটা আমাকে অদ্ভুত এক দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। ভাইয়ের টেবিলে উপুড় হয়ে পড়া বইটা আমার পূর্ব বর্ণনার সাথে যদিও হুবহু মিল খায়, কিন্তু ব্যাংক বইটা না!

হঠাৎ মনে হলো আচ্ছা দেখি বইটি কি ভাইয়ার নাকি অন্য কারোর। এবার বইটির প্রথম পৃষ্টা থেকে নাম খুঁজা শুরু করলাম। বইয়ের উপরের মোটা মলাটটি উল্টিয়ে ডান পাশে তাকাতেই যে নামটি দেখলাম, তাতে আমার মানসিক অবস্থা আরো এলোমেলো হয়ে যায়। কেননা সেখানে ভাইয়ার নিজের নামটিই ছিলো!

বইটির উপরের প্রথম মোটা পাতাটা আমার ‘বাম’ হাতে, আর চোখ পড়ে আছে ডান পৃষ্টায় তার নামের উপর। তীব্র হতাশা নিয়ে যখন চোখের দৃষ্টিকে বইয়ের পৃষ্টা থেকে তুলে নেওয়ার জন্য সরানোর চেষ্টা করলাম, তখন বাম হাতে অর্ধ খোলা পৃষ্টাটার পিছনের অংশে চোখ গেল। এই পৃষ্টাটা সাধারণত লিখাবিহীন অনেকটা ‘এস’ কালারের মতো থাকে, যদিও এখানে আছে ছোট ছোট অনেক লেখা..!

স্কুল লাইফে আমরা ও লিখে রাখতাম অনেক ছোট ছোট রোমান্টিক কিংবা হাস্যকর ছন্দ।
যা দেখে অনেক সময় হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হতো, আবার কখনো তীব্র প্রেমময়ী হয়ে উঠতাম।
একদিন তো স্কুলের ম্যাম এমন ছন্দ দেখে আমাকে সেই রকমের ঝারি বললো, তুমি ক্লাসের ফার্স্ট বয়, তোমার বইয়ে যদি এগুলো লিখা থাকে তাহলে অন্যরা কি শিখবে! অল্প বয়সে এতো ট্যাটনামি ভালো না, এখনি এগুলো কাটো এবং আর যেন কখনো এসব না দেখি। তারপর থেকে ক্লাসে এসে ম্যাম বই চাইলে অনেকেই দিতে চাইতো না, কারন ছন্দের উপর ঘষামাজা তাদের বইয়েও আছে। অপমানের ভাগ কে নিতে চায়!

যাইহোক, আজকের এই ছন্দ গুলো দেখার পর, না আনন্দিত হলাম ; না হলাম প্রেমময়ী। এ যেন এক ভিন্ন অনুভূতি!

যেখানে লিখা ছিলো, “আপনি কি আপনার মায়ের সাথে যেনা করার জন্য প্রস্তুতী নিতে চান? তাহলে অনুগ্রহপূর্বক বইটি আজ থেকেই পড়া শুরু করুন!”

এর নিচের ছন্দটা ছিলো, “আপনি আসলে কেমন ছেলে!? যে… মায়ের সাথে যেনা করার প্রস্তুতি নিতে লজ্জ্বাবোধ করেনা!”

তারপরের ছন্দটি ছিলো, “ও বুঝেছি, যেনা শব্দটি আপনার কলিজায় ততটা ঘাঁ দিতে পারেনি, মায়ের সাথে সেক্স এই শব্দটা যতটা ঘাঁ দিতে পারতো.! “

উপরের মলাটের পিছনে পেন্সিল দিয়ে গাঢ় করে লিখে রাখা এই পৃষ্টার লেখাগুলো পড়তেই আমার দুচোখ-মুখ সাদা থেকে লাল, লাল থেকে নীল ও গাঢ় কালো বর্ণ ধারন করেছে। নিজের প্রতি তীব্র রাগ , কান্না আর হতাশা এই প্রথম আমায় একসাথে আচ্ছাদিত করলো। বইয়ের পেছনের মলাটটাতে কিছু লিখা আছে কিনা তা দেখার জন্য কেমন জানি এক ঘৃণাময় আগ্রহ জন্ম নিলো। সেখানেও শেষ পাতার পিছনে ঠিক মাঝখানে লিখা ছিলো,

” হে আব্দুল্লাহ্ , যদি আল্লাহ্ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধ করতে না চাও তবে নিজেকে সামলাও, কেননা তুমি তো এই যুদ্ধের জন্য খুবই অযোগ্য ও অসহায়।”

লিখাগুলো পড়ার পর ভিতরটা একটা বড়-সড় ধাক্কা দিয়ে উঠলো। নিজেকে সামলানোর সাথে বইটিকে ও তার নিজের জায়গায় সামলাতে না সামলাতেই ‘আব্দুল্লাহ্ ভাই’ ভেজা গামছাটা তার পিঠে ছড়িয়ে দিয়ে লুঙ্গি পড়ে বাথরুম থেকে বের হলেন। আমি সালাম দিবার আগেই আমাকে সালাম দিয়ে কিছুটা অবাক করা মৃদ্যু হাসিতে বললেন, সাইফুল্লাহ্! এতদিন পর! আসছো কখন! আমি নিজেকে সামলিয়ে মৃদ্যু স্বরে বললাম- এইতো ভাই, অল্প কিছুক্ষণ। আসার পর সাফফাত ভাই বললো আপনি বাথ রুমে।

তিনি খুব তাড়াহুড়া করে গামছাটা জানালার গ্রিলে ছড়িয়ে দিয়ে, হলের ব্যান্ডিং করা একটা ফুল হাতার টি শার্ট পড়ে বললেন, চলো যাই… আমি বললাম কোথায় ? তিনি আমার হাত ধরে বেড থেকে টেনে নিয়ে বললেন, যোহরের জামাআতের আর মাত্র ৫ মিনিট আছে, যেতে যেতেই ২ মিনিট চলে যাবে। জলদি চলো, এসে দুপুরে খেয়ে তারপর কথা হবে…!

আমি হাঁটছি মহৎ এই মানুষটির পা ফেলার কদম গুলোকে দেখে দেখে, আর ভাবছি জীবনে এই মানুষটিকে আরো আগে থেকেই গভীরভাবে দরকার ছিলো।

—পর্ব:০২ এ জানবেন: কনফিউজসড করা বইয়ের পৃষ্ঠারগুলোর আত্মকাহিনী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here